top of page

শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় ও অভিভাবকের মাঝে সংযোগ ঘটাচ্ছে ডিপিএফ মুন্সিগঞ্জ

Updated: Dec 6, 2022

স্কুল পরিচালনায় অভিভাবকদের ভূমিকা সম্পর্কে সামান্যই জানতেন নাজমা আক্তার। মুন্সীগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট পলিসি ফোরাম (ডিপিএফ) আয়োজিত আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করার পর তিনি বুঝতে পারেন, তথ্য অধিকার বা অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার মতো সামাজিক দায়বদ্ধতার উপকরণগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে অভিভাবকরা আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেন। ডিপিএফের কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, "ক্যাম্পাস ডায়ালগের মতো আরও সক্রিয় কর্মসূচি আয়োজন করলে আরও ভালো হতো।”


জেলার দুটি স্কুল পরিচালনা কমিটির সাথে যুক্ত ক্রীড়া সংগঠক মো. আয়নাল হক স্বপন। তিনি মুন্সীগঞ্জে এই প্রথম এমন অসাধারণ একটি উদ্যোগ দেখছেন। তিনি বলেন, “এই ফোরামের মাধ্যমে অনেকেই তথ্য অধিকার ও সিটিজেন চার্টারের মতো সামাজিক দায়বদ্ধতার উপকরণগুলো সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।” স্বপন জানান, তিনি যে দুটি স্কুলের কমিটির সদস্য, সেখানে তথ্য অধিকার ও শুদ্ধাচার নিশ্চিত করতে অভিভাবকদেরকে প্রধান শিক্ষকদের ফোন নম্বর দেয়া হয়েছে।

“এই কাজ আমরা আগে কখনও করিনি এবং সম্ভবত ডিপিএফ না থাকলে কখনো করা হতোও না।”

“কর্মসূচিতে ক্যাম্পাস সংলাপের মতো ইন্টারেক্টিভ বিষয়থাকলে আরো ভাল হতো”, শিক্ষার মানোন্নয়নে ডিপিএফের কর্মসূচির বিষয়ে নাজমা আক্তার।


ইউরোপিয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ও বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সহায়তায় প্ল্যাটফর্মস ফর ডায়ালগ (পিফরডি) প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ প্রকল্পেরই নতুন উদ্যোগ হলো ডিস্ট্রিক্ট পলিসি ফোরাম। সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রধান চারটি উপকরণ – সিটিজেন চার্টার, তথ্য অধিকার, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল ও অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহিতা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সুশীল সমাজ ও জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করছে এই ফোরাম। দেশের ১২টি জেলায় পিফরডির আওতায় এমন ১২টি পলিসি ফোরাম গঠন করা হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, বাল্যবিয়ে রোধ ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবার মান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে কাজ করছে জেলাভিত্তিক এসব ফোরাম। তাদের লক্ষ্য ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রধান চারটি উপকরণ ব্যবহার করে সহযোগিতামূলক ও ঐক্যবদ্ধ পদ্ধতিতে সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশাসন ও সুশীল সমাজের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনা।


মুন্সীগঞ্জ ডিপিএফ তাদের প্রথম সভায় মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফোরামের সভাপতি খালেদা খানম বলেন,

“শিক্ষাকে জাতিসংঘ চতুর্থ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করেই আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

শিক্ষক, আইনজীবী ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি সহ ২০ জন সদস্যের সমন্বয়ে ডিপিএফ গঠনে মূল ভূমিকা পালন করেন পিফরডি প্রকল্পের জেলা কর্মকর্তা বিবি আয়েশা। ডিপিএফ সদস্যদের জেলা-ভিত্তিক এনজিও বা সিএসও বা পার্টনার সিএসও বা মাল্টি-অ্যাক্টরস পার্টনারশিপ (এমএপি) গ্রুপ প্রতিনিধি, বা সুশীল সমাজের সদস্যদের মধ্য থেকে এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট মানদণ্ডের মধ্যে থেকে নির্বাচিত করা হয়েছিল। ফোরামে স্থানীয় সরকারের অন্তত একজন প্রতিনিধি থাকার শর্ত ছিল। পৌরসভার প্যানেল মেয়র এবং কাউন্সিলর সোহেল রানাকে সহ-সভাপতি নির্বাচিত করার মাধ্যমে সে শর্ত ভালোভাবেই পূরণ হয়েছে মুন্সীগঞ্জ ডিপিএফ। সভাপতি খালেদা খানম ও সেক্রেটারি হামিদা খাতুন ছাড়াও এই ফোরামে আরও চারজন নারী রয়েছেন।


বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ওয়াসিউর রহমান বৃন্ত জানান, তিনি আগে SAT সম্পর্কে জানতেন না। “ডিপিএফের বৈঠকগুলো থেকে আমরা তথ্য অধিকার সম্পর্কে জানতে পেরেছি। এটা নাগরিকদের জন্য দারুণ শক্তিশালী একটা হাতিয়ার। এসব বৈঠকে থেকে সাধারণ মানুষ এমন আরো কিছু উপকরণ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন, যেগুলো তারা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য ব্যবহার করতে পারেন।

” বৃন্ত মনে করেন, এসব উপকরণ সম্পর্কে জানার কারণে পরবর্তী প্রজন্ম দুর্নীতিকে রুখে দিতে পারবে। উপকরণগুলো এখনো স্কুল কলেজের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত না করা হয়ে থাকলে দ্রুত তা করা উচিত।”

ফোরামের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার পর স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ও একটি নাগরিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা রিয়াজউদ্দিন রায়হান স্কুলছাত্রদেরকে বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস ও অনলাইন টুলসের ব্যবহার শেখাতে কয়েকটি কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ আয়োজন করেছেন।


ডিপিএফ সদস্যদেরকে অ্যাডভোকেসি কৌশল শেখাতে ১৫ দিনের একটি অনলাইন প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছিল পিফরডি। অর্ধমাসব্যাপী এই প্রশিক্ষণে ডিপিএফ সদস্যরা জেলায় শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিখেছেন।


অর্জিত সেই জ্ঞানের ভিত্তিতে তারা তাদের ছয় মাস ব্যাপী কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথমেই ইছাপুরা সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দিন একটি পজিশন পেপার তৈরি করেন। পজিশন পেপারে জেলার স্কুলগুলোর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়। শিক্ষকদেরকে ফোরামের কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ডিপিএফ সদস্যরা ইছাপুরা সরকারি মডেল স্কুল, মালখানগর উচ্চ বিদ্যালয়, সোনারং সরকারি পাইলট মডেল স্কুল সহ বেশ কয়েকটি স্কুল পরিদর্শন করেন।


ডিপিএফের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন,

“কাজ করার জন্য শিক্ষার মানোন্নয়ন একটি দারুণ বিষয়। আর সরকারের নিজস্ব উপকরণগুলো ব্যবহার করে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম করা আরো বেশি অভিনব এবং গঠনমূলক।”

ডিপিএফের কার্যক্রমের মধ্যে ছিল আলোচনাসভা, কয়েকটি দিবস উদযাপন ও প্রতিমাসে একটি করে নিয়মিত বৈঠক। তবে মুন্সিগঞ্জ পলিসি ফোরাম বিশেষভাবে গর্বিত তাদের আয়োজিত গণশুনানি নিয়ে। কারণ, সেখানে সাধারণ মানুষ সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন সরকারি সেবার বিষয়ে নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরতে পেরেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এটি ছিল বিরল একটি সুযোগ। শুনানিতে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা নাগরিকদের অভিযোগসমূহ দ্রুত প্রতিকারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।


অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ডিপিএফকে আশ্বস্ত করেছেন যে, শিক্ষার মাননোন্নয়নে শিক্ষক-অভিভাবক সভা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস ও কার্যকর স্কুল কমিটি নিশ্চিতকরণের মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি সরাসরি তদারক করবেন।


ডিপিএফের সাধারণ সম্পাদক হামিদা খাতুনের মতে, মুন্সীগঞ্জে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিভাবকরা সচেতন নন।

“অভিভাবকেরা নিজেদের নাগরিক অধিকার ও তাদের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হলে অ্যাডভোকেসির কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যায় না। আমরা আমাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি,”

বলছিলেন হামিদা। তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগের ফল দৃশ্যমান হতে সময় লাগে।


পিফরডি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও শিক্ষার মানোন্নয়নে নিরলস কাজ করে যেতে চান মুন্সীগঞ্জ ডিপিএফের সদস্যরা। তাদের মতে,

“শিক্ষার মানোন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নয়, বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।”

এই প্রকাশনাটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় তৈরি। প্রকাশনার বিষয়বস্তুর দায়িত্ব প্ল্যাটফর্মস ফর ডায়ালগ প্রকল্পের। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতামতকে প্রতিফলিত নাও করতে পারে।

Commenti


bottom of page