• Platforms for Dialogue

সামাজিক সংলাপ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এলাকার উন্নয়নে কাজ করছে একটি সিএসও প্রতিষ্ঠানঃ সামাজিক সুবিচার



২০০০ সালে পাবনা সদর উপজেলার ভারারা ইউনিয়নে প্রকাশ মানবিক উন্নয়ন সংস্থা নামের সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন মো: গোলাম মোস্তফা। ভারারার বাসিন্দাদের কল্যাণ করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেন তিনি। মোস্তফা বলেন, “আমাদের এলাকা বন্যাপ্রবণ হওয়ায় এখানকার মানুষকে প্রায়ই নানা সমস্যায় ভুগতে হয়। তাই আমার মনে হলো, এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নত করার জন্য কিছু একটা করা দরকার।”


পেশায় গোলাম মোস্তফা একজন কলেজ শিক্ষক। ক্ষুদ্রঋণ, সঞ্চয়, গবাদি পশুপালন, সেলাই, কৃষিকাজ ইত্যাদির মাধ্যমে তিনি এলাকার মানুষকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেন।


বন্যার সময় ভূমি ক্ষয় রোধ করতে প্রকাশ মানবিক উন্নয়ন সংস্থা এলাকায় বৃক্ষরোপন কর্মসূচীও গ্রহণ করে। তাছাড়া, স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরিতেও কাজ করে তারা। বিশুদ্ধ খাবার পানি নিশ্চিত করতে এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করে। এ কাজে তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে ‘মুসলিম এইড ইউকে, বাংলাদেশ’।


মোস্তফা বলেন, “আমরা ছোট একটি সংগঠন। তবে এই স্বল্প পরিসর ও সামর্থ্যের মধ্যেই আমরা মানুষের জন্য ভালো কাজ করার চেষ্টা করি।”


২০১৭ সালে সংস্থাটি ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্লাটফর্মস ফর ডায়লগ (পিফরডি) প্রকল্পের আওতাভুক্ত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সহায়তায় তিন বছর মেয়াদী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ব্রিটিশ কাউন্সিল।


সুশীল সমাজ সংস্থাটির সদস্যগণ নিজেদের নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক মিটিংএ অংশগ্রহণ করছে।


পিফরডির সাথে সংস্থাটি তথ্য অধিকার, কৃষিকাজ ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ বিষয়ক তিনটি সোশ্যাল অ্যাকশন প্রজেক্ট (এসএপি) বাস্তবায়ন করে।


তথ্য অধিকার এসএপির মধ্যে রয়েছে সরকারের অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঠিকমতো সেবা না পেলে জনগণের লিখিত অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে সাহায্য করে।


“স্কুল কলেজে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে তথ্য অধিকারের বৈঠকগুলোর আয়োজন করা হয়,” জানালেন মোস্তফা। কুইজ প্রতিযোগিতা, কর্মশালা ও বৈঠক আয়োজনের মাধ্যমে সংস্থাটি তাদের এসএপিকে আরো বেশি অংশগ্রহণমূলক ও সফল করার চেষ্টা করে।


তিনি বলেন, “মানুষকে জনসম্মুখে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন করা হয় যেন ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিতসহ সকল শ্রেনী-পেশার মানুষ সচেতন হতে পারে। তাদের সবারই সরকারি অফিসে সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।”


তথ্য অধিকার এসএপির আওতায় মানুষকে সিটিজেন চার্টার বিষয়েও সচেতন করা হয়। “এলাকার মানুষ এখন সিটিজেন চার্টার সম্পর্কে জানেন। ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে গেলে তারা সেই চার্টার অনুসরণও করেন।”


কৃষি বিষয়ক এসএপির আওতায় সংগঠনটি কৃষক ও সরকারি কর্মকর্তাদেরকে নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করে।


“অনেক কৃষকই সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলতে পারতেন না। তাদের কাছ থেকে তথ্য কিংবা সাহায্য পাওয়ার উপায়ও জানতেন না। তাই আমরা তাদের মাঝে যোগাযোগের সহজ পথ তৈরি করে দিয়েছি,” বলছিলেন গোলাম মোস্তফা।

বৈঠকে কৃষকদেরকে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করার ক্ষতিকর দিক নিয়ে সতর্ক করা হয় এবং জৈবসারের উপকারিতা ও বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানো হয়। “আমরা প্রতিবারে ৪০ জন করে কৃষক নিয়ে ছোট ছোট উঠান বৈঠকের আয়োজন করি। এভাবে তাদের বিভিন্ন প্রয়োজন ও সমস্যাগুলোতে গুরুত্ব দেয়া সহজ হয়।”


স্থানীয় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যৌন হয়রানি রোধে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকগুলোতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ অংশ নেন।


“যৌন হয়রানি বিষয়ক বৈঠকগুলোতে আমরা দারুণ সাড়া পেয়েছি। বর্তমানে এটা খুবই গুরুতর একটা সমস্যা। সবাই এ সমস্যার দ্রুত সমাধান চান,” বলছিলেন গোলাম মোস্তফা। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদেরকে, বিশেষ করে ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদেরকে এই বিষয়ে সহায়তা পাওয়ার উপায় শেখানো হয়।


“তাদেরকে ৩৩৩ ও ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে সাহায্য নেয়ার উপায় শেখানো হয়।”


ছোট একটি সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও এ সংস্থার সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের মানুষের জীবন সুন্দর ও সহজ করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। পিফরডি প্রকল্পের ব্যাপারে মোস্তফা বলেন, “ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাথে যৌথভাবে কাজ করার ফলে আমরা কাজ করার নতুন উদ্যোম ফিরে পেয়েছি, উৎসাহ পেয়েছি কাজের পরিধি বাড়ানোর।”


এখন পর্যন্ত সংস্থাটি তিন হাজারেরও বেশি মানুষকে সহায়তা করেছে এবং এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। “আমাদের সাতজন নির্বাহী সদস্য, ২১ জন সাধারণ সদস্য ও পাঁচজন কর্মী আছেন। তারা এলাকাবাসীর কল্যাণে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছেন।”


গোলাম মোস্তফা ও তার সহকর্মীরা মনে করেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের এই প্রকল্প চালু রাখা উচিত।


“আমি ব্রিটিশ কাউন্সিলকে অনুরোধ করব যেন দেশের প্রতিটি উপজেলায় অথবা অন্তত প্রতিটি জেলায় এ প্রকল্প চালু করা হয়। তাও সম্ভব না হলে অনুরোধ করব যেন বর্তমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করা না হয়।”


পরিশেষে, তার সংগঠনের সাথে কাজ করার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিলকে ধন্যবাদ জানান গোলাম মোস্তফা। আগামী দিনগুলোতেও ভালো কাজ চালিয়ে যাবেন বলে অঙ্গীকার করেন তিনি।



29 views0 comments